যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত ২৭তম দিনে গড়িয়েছে। প্রথম আঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তার পরিবারসহ হত্যার পরও দেশটির ইসলামী শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটাতে না পেরে একের পর এক নেতা ও কমান্ডারকে হত্যা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে, শক্ত জবাব দিয়ে চলেছে তেহরানও। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ভয়ংকর সব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
সব মিলিয়ে যতটা সহজে ইরানকে পরাস্ত করবেন বলে ভেবেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা, তেমনটা তো হচ্ছেই না; বরং ইরানের জবাবের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ছে তাদের সব পরিকল্পনা। এরই মধ্যে ফুরিয়ে আসতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদও। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার তাই ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।
যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিলে রাশিয়ার সঙ্গে গত চার বছর ধরে চলামান যুদ্ধে একেবারে দুর্বল হয়ে পড়বে ইউক্রেন। অনেক বিশ্লেষকই, যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনাকে তুলনা করছেন ইউক্রেনকে ‘কোরবানি’ দেওয়ার সঙ্গে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) পেন্টাগন সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাতে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এ পরিকল্পনার তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট।
সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চার সপ্তাহেরও কম সময়ের যুদ্ধে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানে ৯ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এই বিপুল পরিমাণ হামলায় আমেরিকার নিজস্ব মজুত দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ফলে, কিয়েভকে দেওয়ার কথা ছিল এমন গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু আধুনিক সমরাস্ত্র এখন মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পাঠানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
পেন্টাগন যে অস্ত্রগুলো ইউক্রেন থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ন্যাটোর একটি বিশেষ কর্মসূচির আওতায় কেনা ইন্টারসেপ্টর মিসাইল। গত বছর চালু হওয়া ‘প্রায়োরিটাইজড ইউক্রেন রিকোয়ারমেন্টস লিস্ট’ উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ধু দেশগুলো কিয়েভের জন্য আমেরিকার কাছ থেকে সরাসরি অস্ত্র কিনত। ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের সরাসরি নিরাপত্তা সহায়তা কমিয়ে দিলেও এই উদ্যোগের মাধ্যমেই এত দিন অস্ত্রের সরবরাহ সচল ছিল।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত গ্রীষ্ম থেকে ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির ৭৫ শতাংশ মিসাইল এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় সব গোলাবারুদ এই কর্মসূচির মাধ্যমেই সরবরাহ করা হয়েছে। এখন সেই সরবরাহে টান পড়লে রাশিয়ার মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সামনে কিয়েভ কার্যত নিরস্ত্র হয়ে পড়বে।
এ অবস্থায় এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন ইউক্রেনের প্রধান ইউরোপীয় সমর্থকরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন যেভাবে গোলাবারুদ ব্যবহার করছে, তাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজস্ব ক্রয়াদেশ বিলম্বিত হতে পারে। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘তারা যে হারে গোলাবারুদ পোড়াচ্ছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে যে এই চুক্তির মাধ্যমে তারা আর কতদিন সরবরাহ বজায় রাখতে পারবে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাচ্ছেন, তার মধ্যে ওই উদ্যোগ ছিল ন্যাটোর জন্য কিয়েভকে সুরক্ষিত রাখার একটি বিকল্প পথ। ইউরোপীয়রা বিল পরিশোধ করত আর আমেরিকা অস্ত্র দিত, এতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিজয়ও নিশ্চিত হত। কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে।
পেন্টাগন ইতোমধ্যে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে প্যাট্রিয়ট এবং থাড-এর মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সরিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে নিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্য হলো, ইরানি ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে পারস্য উপসাগরীয় মিত্র ও মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করা।
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইউক্রেনে ভবিষ্যতে যে সামরিক প্যাকেজগুলো পাঠানো হবে, তাতে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। দ্বিতীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘নীতিগত বিতর্ক এখন এটাই যে, ইউক্রেনকে আর কতটুকু দেওয়া যায়? এটি এখন একটি অত্যন্ত চলমান ও জরুরি আলোচনা।’
এদিকে ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পূরক প্রতিরক্ষা বাজেটের আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যেই সোমবার পেন্টাগন কংগ্রেসকে জানিয়েছে যে, তারা ওই কর্মসূচির আওতায় ন্যাটো দেশগুলোর দেওয়া প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ইউক্রেনে না পাঠিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব মজুত গড়তে ব্যবহার করতে চায়।
ইউক্রেনের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওলগা স্টিফেনিশিনা এক বিবৃতিতে বলেছেন, কিয়েভ তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা চাহিদার বিষয়ে অংশীদারদের অবহিত করছে। তবে, যুদ্ধের এই ‘চরম অনিশ্চয়তার সময়’ সম্পর্কেও তারা সচেতন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, প্রতিরক্ষা বিভাগ মার্কিন বাহিনী এবং আমাদের মিত্র ও অংশীদারদের জয়ী হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করবে। তবে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অবশ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কিয়েভের প্রধান ইউরোপীয় মিত্ররাই ইউক্রেনীয় বাহিনীকে অর্থায়ন ও অস্ত্রশস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে, পিইউআরএলের মাধ্যমে ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির গোলাবারুদ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর।
ইউক্রেনীয় শহর ও অবকাঠামোর ওপর রাশিয়ার ক্রমাগত হামলার মুখে এই সরঞ্জামগুলো কিয়েভের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। ২৭ দিন ধরে চলমান যুদ্ধে এরই মধ্যে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারিয়েছে ইরান। দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এখন পর্যন্ত।
তবে, পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা শুরু করে ইরান, যা এখনও চলছে। সেইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের সংকটও তৈরি করে ফেলেছে দেশটি।
এ অবস্থায় ইরানে আরও ভয়ংকর আঘাত হানার পরিকল্পনা আঁটছে যুক্তরাষ্ট্র; ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে স্থল হামলা চালানোর। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্রের এমন পরিকল্পনার মুখে এবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবরোধ জারির হুমকি দিয়েছে ইরান।
বাব আল-মান্দেব প্রণালিটির অবস্থান ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। সংকীর্ণ এই জলপথটি একদিকে লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, অপরদিকে সুয়েজ খালে নৌযানের চলাচল অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণও করে। জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই প্রণালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্র উপকূলে যেসব তেলখনি আছে, সেসব থেকে উৎপদিত তেলের ১২ শতাংশ বাব আল-মান্দেব দিয়েই পরিবহন করা হয়।
বাব আল-মান্দেবের অবস্থান ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হলেও এই প্রণালিতে অবরোধ জারির সক্ষমতা আছে ইরানের। কারণ, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের সমর্থন ও মদতপুষ্ট সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীরা। ইতোমধ্যে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে আইআরজিসির এবং হুথি নেতারা এক্ষেত্রে ইরানকে পূর্ণ সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আরটিভি/এসএইচএম


